
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘর্ষের মধ্যে একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন জ্বলছে। তেহরান, ইরান, ২ মার্চ
মধ্যপ্রাচ্য
বিবিসির বিশ্লেষণ
ইরানে যুদ্ধ মোড় নিচ্ছে কোন দিকে
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া এই নতুন যুদ্ধে আমরা খুব বেশি সময় পার করিনি। এটি ইতিমধ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। কারণ, ইরান তাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোতে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার যে আগের অবস্থান ছিল, যুক্তরাজ্য তা থেকে সরে এসেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমার মুঠোফোনে একের পর এক নিউজ অ্যালার্ট আসছে। একটু আগেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পড়লাম। সেখানে বলা হয়েছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ‘ভুলবশত নিজেদের গুলিতে’ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
এই লেখা শেষ করার আগেই হয়তো আরও বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হবে। আর এখন যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো মারা পড়বেন।
এই যুদ্ধ কখন বা কীভাবে শেষ হবে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সময় এখনো আসেনি। একবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলো কীভাবে এর সমাপ্তি টানতে চায়, তার কিছু সম্ভাব্য উপায় খুঁজে দেখ যাক।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে বিজয়ের সংজ্ঞা
ফ্লোরিডার বাসভবন মার-এ-লাগো থেকে এক ভিডিও বার্তায় যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর পর থেকেই তিনি বরাবরের মতো মার্কিন শক্তির ব্যাপারে চরম আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে আসছেন। অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো ওভাল অফিসের রেজোলিউট ডেস্কের সামনে বসে গম্ভীর মুখে এ ধরনের ভাষণ দিতেন।
কিন্তু ট্রাম্প পরেছিলেন একটি ওপেন-নেক শার্ট ও মাথায় ছিল সাদা রঙের বেসবল ক্যাপ, যা তাঁর চোখ পর্যন্ত ঢেকে রাখছিল। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প যেকোনো সময় তাঁর মত বদলাতে পারেন। তবে ওই ভাষণে তিনি তাঁর নিজের মতো করে বিজয়ের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। এটি একটি তালিকার মতো:
‘আমরা তাদের সব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনশিল্পকে ধূলিসাৎ করে দেব। এটি আবারও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’
‘আমরা তাদের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলব।’
‘আমরা নিশ্চিত করব যেন এই অঞ্চলের সন্ত্রাসী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো আর কখনো মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। তারা যেন আমাদের বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে না পারে। তারা যেন আর আইইডি বা রাস্তার ধারের বোমা ব্যবহার করে অসংখ্য মার্কিন নাগরিকসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা বা গুরুতর আহত করতে না পারে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও এই দাবির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটাও দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা গত গ্রীষ্মে দেওয়া তাঁর নিজের বক্তব্যেরই বিরোধী। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছে।
এখন পর্যন্ত—এবং আমি বারবার বলছি, এই লেখাটি যখন লিখছি তখন যুদ্ধের মাত্র তৃতীয় দিন—ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যেমনটা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ (সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ) মস্কোতে পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর বাহিনীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
প্রথাগত সশস্ত্র বাহিনী ও সুসজ্জিত পুলিশের পাশাপাশি দেশটিতে রয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)। দেশে ও দেশের বাইরে ইরান সরকারকে রক্ষা করার সুস্পষ্ট দায়িত্ব এই বাহিনীর ওপর ন্যস্ত।
এটি মূলত ‘ভেলায়েত-ই ফকিহ’ বা ইসলামি আইনবিদদের অভিভাবকত্বের পেছনে পেশিশক্তি হিসেবে কাজ করে। এটিই ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মূল মতবাদ, যা শিয়া ধর্মীয় নেতাদের শাসনকে বৈধতা দেয়।
ধারণা করা হয়, আইআরজিসির ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সেনা ও প্রায় ৬ লাখ অনিয়মিত সেনা রয়েছে। ধর্মীয় মতবাদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশও তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আনুগত্য ধরে রাখার পেছনে এই নেতাদের আদর্শিক কারণের পাশাপাশি আর্থিক কারণও রয়েছে।
আইআরজিসিকে সহায়তা করে ‘বাসিজ’ নামের একটি আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। আনুমানিক সাড়ে চার লাখ সদস্যের এই বাহিনীর যেমন সরকারের প্রতি আনুগত্যের সুখ্যাতি রয়েছে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে দস্যুতার অভিযোগ রয়েছে।
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তেহরানে যখন বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন সরকারের প্রতিরক্ষার প্রথম সারিতে আমি তাদের কাজ করতে দেখেছি। তারা রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিত এবং লাঠি ও রাবারের ডান্ডা দিয়ে ব্যাপক মারধর করত।
তাদের পেছনে থাকত ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ ও আইআরজিসির সদস্যরা। বাসিজ বাহিনীর দ্রুতগতির মোটরসাইকেল স্কোয়াডও ছিল, যারা শহরের যেকোনো প্রান্তে ভিন্নমত বা বিক্ষোভ দমাতে ছুটে যেত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যথায় তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘এর পরিণতি খুব একটা সুখকর হবে না।’
তবে ট্রাম্পের এই হুমকিতে ইরান সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মত বদলানোর সম্ভাবনা খুবই কম।
কারণ, ইসলামি প্রজাতন্ত্র (ইরান) ও শিয়া ইসলাম শাহাদাতের (শহীদ হওয়ার) আদর্শে উদ্বুদ্ধ।
গত রোববার কয়েক ঘণ্টা ধরে সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছিল যে সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। এরপর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সংবাদপাঠক কাঁদতে কাঁদতে খামেনির মৃত্যুর খবর ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাতের পবিত্র ও সুমিষ্ট সুধা পান করেছেন।
ইরান বিষয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ধারণা করছেন, যখন পুরো বিশ্ব মনে করছিল যেকোনো মুহূর্তে হামলা হতে পারে, তখনো আয়াতুল্লাহ তাঁর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে তেহরানের বাসভবনে বৈঠক চালিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি নিজেই শাহাদাত বরণ করতে চেয়েছিলেন।
এই সরকারের প্রতি অনুগত একটি বড় বেসামরিক গোষ্ঠী রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর, ৪০ দিনের শোক পালনের প্রথম দিনেই তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় চারদিকে যখন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল, তখনো তাঁরা শহরের বিভিন্ন চত্বরে জড়ো হয়ে মোমবাতি ও মুঠোফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন।
খারাপ নজির
মার্কিনিরা বিশ্বাস করে যে এবার ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিপুল সামরিক শক্তি কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই শত্রুপক্ষের সরকার পরিবর্তন করতে পারবে।
তবে অতীতের নজিরগুলো মোটেও ভালো নয়। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফলে সেখানে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধ উগ্রবাদী জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর জন্ম দিয়েছে, যাদের অস্তিত্ব এখনো রয়ে গেছে।
লিবিয়া এমন একটি দেশ ছিল, যার তেলের মজুত দিয়ে এর ছোট জনসংখ্যার মানুষের পশ্চিমা মানের জীবনযাপন নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার ১৫ বছর পর দেশটি আজ একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত, দরিদ্র ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
যেসব পশ্চিমা দেশ তাঁর পতন ত্বরান্বিত করেছিল এবং এ নিয়ে উদ্যাপন করেছিল, দেশটি টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়ার পর তারা খুব সহজেই নিজেদের দায় এড়িয়ে গেছে।
ইরান একটি বিশাল দেশ। এটি ইরাকের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়। দেশটিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৯ কোটির বেশি মানুষের বসবাস।
যদি সত্যিই ইরান সরকারের পতন ঘটে, তবে এর পরিণতি হতে পারে চরম ভয়াবহ। এর ফলে যে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও রক্তপাত শুরু হবে, তা সিরিয়া ও ইরাকের সেই গৃহযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে তেহরান সরকার যদি টিকে-ও যায়, তবু মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যাবে।
এই সরকারের পতন হলে বহু ইরানি, সম্ভবত বেশির ভাগ মানুষই উল্লাস প্রকাশ করবে। কিন্তু গায়ের জোরে একটি শাসকগোষ্ঠীকে সরিয়ে সেখানে শান্তিপূর্ণ ও সুসংহত একটি বিকল্প দাঁড় করানো হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
ট্রাম্প বাজি ধরেছেন যে এটি সম্ভব এবং এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও উন্নত ও নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করবে। এমনটি ঘটার সম্ভাবনা খুবই চ্যালেঞ্জিং।


